হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আসলে কী ঘটে?
- Dr Debjyoti Dutta

- 2 days ago
- 3 min read

হাঁটুর ব্যথা: শুধুই বয়সের সমস্যা নয়
হাঁটুর ব্যথা এখন আর শুধুই বার্ধক্যের সমস্যা নয়। আজকাল চল্লিশ পেরোতেই অনেকেই হাঁটুতে ব্যথা, শক্তভাব, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট কিংবা দীর্ঘক্ষণ বসে উঠতে অসুবিধার কথা বলছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর পিছনে রয়েছে হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস। কিন্তু এই রোগটি সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ণ। সাধারণভাবে আমরা মনে করি, অস্টিওআর্থ্রাইটিস মানেই হাঁটুর কার্টিলেজ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়া। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস একটি জটিল, ধাপে ধাপে এগোনো রোগ, যেখানে শুধু কার্টিলেজ নয়, পুরো হাঁটু জয়েন্টটাই ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়।
সুস্থ হাঁটু কীভাবে কাজ করে
হাঁটু মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জয়েন্টগুলির একটি। হাঁটা, দৌড়নো, বসা, ওঠা, সিঁড়ি ভাঙা—প্রতিটি কাজেই হাঁটুকে বহন করতে হয় শরীরের সম্পূর্ণ ওজন। স্বাভাবিক অবস্থায় হাঁটুর ভেতরে থাকা কার্টিলেজ হাড়ের মাথাগুলিকে মসৃণভাবে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। সিনোভিয়াল তরল হাঁটুর ভিতরে তেলের মতো কাজ করে, আর মেনিস্কাস নামের গঠন দুটি ধাক্কা শোষণ করে হাঁটুকে রক্ষা করে। এই সমন্বয়ের ফলেই আমরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারি।

রোগের সূচনা: কার্টিলেজের নীরব ক্ষয়
অস্টিওআর্থ্রাইটিস শুরু হয় একেবারে নীরবে। রোগের প্রথম পর্যায়ে কার্টিলেজ নরম হয়ে যায় এবং তার উপরিভাগে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে শুরু করে। বাইরে থেকে তখন খুব বেশি পরিবর্তন বোঝা যায় না, এমনকি এক্স-রে করলেও অনেক সময় বিশেষ কিছু ধরা পড়ে না। তবু রোগী বুঝতে পারেন, হাঁটার পর হাঁটু একটু ভার লাগছে, মাঝে মাঝে ব্যথা হচ্ছে বা সকালে উঠে হাঁটু শক্ত লাগছে। এই সামান্য উপসর্গগুলিই ভবিষ্যতের বড় সমস্যার প্রথম সংকেত।
ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ক্ষয়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষয় আরও গভীর হয়। কার্টিলেজ পাতলা হয়ে যায় এবং কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ উঠে যায়। তখন হাড়ের সঙ্গে হাড়ের সরাসরি ঘর্ষণ শুরু হয়। এর ফলেই হাঁটাচলায় ব্যথা বাড়ে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয় এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের ক্ষেত্রে হাঁটু ফুলে যায় এবং সামান্য কাজ করলেই ক্লান্তি চলে আসে।
হাড়েও আসে পরিবর্তন
কার্টিলেজ উঠে গেলে চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ে হাঁটুর হাড়ের উপর। এর ফলে হাড় ধীরে ধীরে শক্ত ও মোটা হয়ে ওঠে এবং তার ভিতরে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়। এই পরিবর্তনগুলি গভীর ব্যথার অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি শরীর হাঁটুকে স্থিতিশীল রাখতে গিয়ে জয়েন্টের চারপাশে বাড়তি হাড় গজাতে শুরু করে, যাকে বলা হয় বোন স্পার। এর ফলে হাঁটুর স্বাভাবিক গঠন বদলে যায় এবং নড়াচড়া আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
ফোলা ও প্রদাহ: যন্ত্রণার মূল উৎস
হাঁটুর ভিতরের আবরণ বা সিনোভিয়াল মেমব্রেনে প্রদাহ হলে অতিরিক্ত তরল জমে হাঁটু ফুলে যায়। ভিতরের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ব্যথা আরও তীব্র হয়। অনেকেই লক্ষ্য করেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটু শক্ত লাগে এবং কিছুক্ষণ হাঁটার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। এই উপসর্গগুলি মূলত এই প্রদাহের ফলেই দেখা দেয়।
মেনিস্কাস, লিগামেন্ট ও পেশির দুর্বলতা
রোগ যত বাড়তে থাকে, হাঁটুর মেনিস্কাস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, লিগামেন্ট ঢিলে হয়ে পড়ে এবং আশপাশের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে হাঁটু আরও অস্থির হয়ে ওঠে, হঠাৎ হড়কে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং ব্যথার তীব্রতা বাড়ে। দৈনন্দিন চলাফেরা ক্রমশ কষ্টকর হয়ে পড়ে।
ব্যথা আসে কোথা থেকে?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—কার্টিলেজে তো স্নায়ু নেই, তবে ব্যথা হয় কোথা থেকে? আসলে এই রোগে ব্যথার উৎস একাধিক। প্রদাহগ্রস্ত সিনোভিয়াম, হাড়ের ভিতরের চাপ, লিগামেন্টের টান, মাংসপেশির খিঁচুনি এবং স্নায়ুর অতিসংবেদনশীলতা মিলিয়েই এই দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সৃষ্টি হয়। তাই অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ব্যথা শুধু যান্ত্রিক নয়, জৈবিক ও স্নায়বিক কারণেও তীব্র হয়।
ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে ঠিকই, তবে অতিরিক্ত ওজন, পুরনো আঘাত, হাঁটুর গঠনগত ত্রুটি, কম চলাফেরা এবং দুর্বল পেশি থাকলে অস্টিওআর্থ্রাইটিস দ্রুত অগ্রসর হয়। চিকিৎসকদের মতে, শরীরের ওজন এক কেজি বাড়লে হাঁটুর উপর তিন থেকে ছয় কেজি অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করে।
শুধুই ‘ওয়্যার অ্যান্ড টিয়ার’ নয়
আধুনিক গবেষণা বলছে, অস্টিওআর্থ্রাইটিস কেবল বয়সজনিত ক্ষয় নয়। এটি একটি সক্রিয় জৈবিক রোগ, যেখানে প্রদাহ, রাসায়নিক পরিবর্তন এবং স্নায়বিক সংবেদনশীলতার বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই শুধুমাত্র ব্যথানাশক খেয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামগ্রিক চিকিৎসা।
সময়মতো চিকিৎসাই ভবিষ্যৎ বাঁচায়
রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করলে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার এড়ানো যায় বা দীর্ঘদিন পিছিয়ে দেওয়া যায়। আধুনিক নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে হাঁটুর কার্যক্ষমতা অনেকাংশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ব্যথামুক্ত চলাফেরাই লক্ষ্য
Samobathi Pain Clinic-এ হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসের জন্য আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক চলাফেরা ফিরিয়ে আনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। উন্নত ফিজিওথেরাপি, আল্ট্রাসাউন্ড গাইডেড ইনজেকশন, পিআরপি থেরাপি, ভিসকোসাপ্লিমেন্টেশন এবং জেনিকুলার নার্ভ রেডিওফ্রিকোয়েন্সি চিকিৎসার মাধ্যমে বহু রোগীই অপারেশন ছাড়াই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সক্ষম হচ্ছেন।
শেষ কথা ( হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আসলে কী ঘটে? )
হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আসলে কী ঘটে? হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিস মানেই জীবনের গতি থেমে যাওয়া নয়। রোগ সম্পর্কে সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমেই সম্ভব ব্যথামুক্ত, সক্রিয় জীবন।


![জার্মানিতে তৈরি জেল দিয়ে নাকি ক্ষয়প্রাপ্ত হাঁটুর কার্টিলেজ আবার গজিয়ে ওঠে — সত্যি কি? Osteoarthritis No Surgery [ফ্যাক্ট-চেক]](https://static.wixstatic.com/media/e2d56d_8c750e5fc7874a858f7bd798e28c7067~mv2.png/v1/fill/w_893,h_667,al_c,q_90,enc_avif,quality_auto/e2d56d_8c750e5fc7874a858f7bd798e28c7067~mv2.png)


Comments